বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী উপমহাদেশের প্রাচীন একটি ইসলামী দল। ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত দলটির আমীর মাওলানা সাইয়িদ আবুল আলা মওদুদীর (রহঃ) সাথে উপমহাদেশের মূলধারার আলেমদের (দেওবন্দী) সাথে সুসম্পর্ক তার দল প্রতিষ্ঠার বহু আগে থেকেই। দেওবন্দী ধারার বৃহত্তর সংগঠন জমিয়তের মুখপাত্র পাক্ষিক জমিয়তের সম্পাদক হওয়ার সুবাদে আকাবিরিনে দেওবন্দের অনেকের সাথে তার সখ্যতা ছিল। তার দল জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠা লগ্নেও মাওলানা মনযুর আহমদ নোমানী (রহঃ) , মাওলানা সাইয়িদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহঃ) প্রমুখরা ছিলেন দলটির শীর্ষ নেতা। পরবর্তীতে মাওলানা মওদুদী মরহুমের লেখনীর সাথে একমত না হতে পেরে সংশোধনের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে তারা বের হয়ে যান। তারপরও আলেমদের অনেকে মরহুম মাওলানা মওদুদীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, মেধা, সেক্যুলারিজম ও কমিউনিজমের বিরুদ্ধে তার ক্ষুরধার লেখার ভূয়সী প্রশংসা করে গেছেন। ইকামাতে দ্বীনের জন্য তার রাজনৈতিক দলের সহকর্মী হয়েছেন। কিন্তু দেওবন্দী আলেমদের অধিকাংশই জামায়াতে ইসলামীর সাথে দূরত্ব বজায় রেখে চলে এসেছেন। তবে ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে, উম্মাহর স্বার্থে, দেশ ও জাতির স্বার্থে উলামায়ে দেওবন্দ নিজেদের মঞ্চে তাদের ডেকেছেন, কখনো তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন। এর নজির আমরা পাকিস্তান, বাংলাদেশে একাধিক বার দেখেছি।
পঞ্চাশের দশকে কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে খতমে নবুওয়াত আন্দোলনে আল্লামা ইউসুফ বিনূরী, মাওলানা মওদুদী একত্রে গর্জে উঠেছিলেন। ১৯৯৯-২০০০ সালে শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহঃ, মুফতী ফজলুল হক আমেনী রহঃ, তৎকালীন আমীরে জামায়াত শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে একত্রে এক মঞ্চে হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে দেখেছি। ৫ ই মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর কর্মী ও ছাত্র শিবিরের সহমর্মিতা-সহযোগিতার কথা সেদিন শাপলা চত্বরে অবস্থানরত হেফাজত কর্মীদের মুখেই শুনেছি। ২০১৮ এর নির্বাচনে সিলেটে জমিয়ত প্রার্থী মাওলানা উবাইদুল্লাহ ফারুক সাহেবকে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাদের সহযোগিতা চেয়ে আশ্বস্ত হতে দেখেছি। আল্লামা সাঈদীর (রহঃ) কারামৃত্যুতে অনেক কওমী আলেমরা ইমানী দায়িত্ব থেকে জুমার বয়ানে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন যার দরুন অনেক খতীবকে চাকরিচ্যূত করা হয়।
কওমী আলেমদের অধিকাংশই ৫ ই আগষ্ট পরবর্তী সময়টাকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য সকল ইসলামপন্থীদের মধ্যে একটি রাজনৈতিক ঐক্যের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সেই অভিন্ন প্রয়োজনেই রাজনৈতিক ঐক্যের কথা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতাগণ শুরু থেকেই বলে আসছেন। দল দু’টির মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে ঐক্যের সুবাতাসও পাওয়া যাচ্ছে। যা এখন সেক্যুলার রাজনীতিকদের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অতি পরিতাপের বিষয় হলো – জামায়াতে ইসলামী ও চরমোনাই এর ইসলামী আন্দোলন যতটা রাজনৈতিক ভাবে একে অপরের কাছাকাছি আসছে, কওমী আলেমদের সাথে জামায়াতে ইসলামীর দূরত্ব ঠিক ততোটাই বেশি হচ্ছে । তার অন্যতম কারণ হচ্ছে উভয় দিকের কিছু শীর্ষ নেতাদের অসতর্ক এবং অসংযত বক্তব্য।
বিশেষ করে সম্প্রতি জামায়াত ঘরানার পরিচিত ও প্রসিদ্ধ বক্তা মুফতী আমির হামজা, মাওলানা তারিক মুনাওয়ার তাদের বক্তব্য থেকে কওমী আলেমদের প্রতি বিদ্বেষ তীব্র ভাবে ছড়িয়েছেন। সেখানে দেখা গেছে মাওলানা তারিক মুনাওয়ার বলছেন যে, দরসে নিজামীর আলেম যারা দেশের বিভিন্ন মসজিদে খতীব, তাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে হবে।
অথচ দেশের অধিকাংশ মসজিদের কওমী ঘরানার আলেমগণ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে গিয়ে নানা ভাবে ফ্যাসিস্ট দ্বারা অত্যাচারিত হয়েছেন । যদিও তিনি পরবর্তীতে এহেন ন্যাক্কারজনক বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু উক্ত বক্তব্যে তার ভেতরের কওমী বিদ্বেষ ফুটে উঠেছে। যা ঐক্যের পথে অন্তরায়।
মুফতী আমির হামজা প্রায়ই কওমী মাদ্রাসা/আলেমদের নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে থাকেন যা নেট দুনিয়ায় ঘুরে বেড়ায়।
সামনে শীতকাল। একই সাথে দেশে ওয়াজ মাহফিল ও নির্বাচনী আবহ বিরাজ করবে। স্পর্শকাতর ঐ সময়ে ভাইরালের নেশায় যাচ্ছেতাই বলে ঐক্যের পরিবেশ যেন নষ্ট না করে তা বক্তাদেরকে সংশ্লিষ্ট দল থেকে কঠোর ভাবে সতর্ক করে দিতে হবে। পরে ক্ষমা চাইলেও বারবার এমন হিংসাত্মক বক্তব্য জাতি কখনোই মেনে নিবেনা। এ ব্যাপারে উদাসীনতা প্রদর্শনের ফলশ্রুতিতে কওমী আলেমদের সাথে রাজনৈতিক ঐক্য বিনষ্টের দায় তাদের নিতে হবে।
সম্পাদক, হামিদুল ইসলাম নাফিস
ভয়েস অফ ইসলাম

