আওয়ামী সরকার পতনের প্রায় দেড় বছর হতে চললো। কিন্তু এখনো খতীবগণ বাক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত। এমনকি কোথাও কোথাও বাস্তবতা দেখে মনে হচ্ছে যে, পূর্বের তুলনায় বরং বর্তমানেই ইমাম-খতীবগণ বাক স্বাধীনতা থেকে বেশি বঞ্চিত।
সম্প্রতি ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী মসজিদ গুলোতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা তাই প্রমাণ করে। খতীবগণ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে কথা বলেন। কুরআন-সুন্নাহ সেকেলে নয় আধুনিক। ব্যক্তি জীবন থেকে সমাজ-রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় যাবতীয় সমস্যার সমাধান কুরআন-সুন্নাহে রয়েছে। একজন খতীব তিনি তার মসজিদের মুসল্লিদের রুহানী চিকিৎসক, তাদের সংশোধনের দায়িত্ব তার উপর ন্যস্ত। খতীব সাহেব ব্যাধি অনুযায়ী চিকিৎসা দিবেন। চক্ষুষ্মান সমাজে যে ব্যাধি যত মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, তিনি সেই বিষয়টি নিয়ে তত বেশি মানুষকে নাসিহাহ দিবেন। তা কখনো হযরত উমরের মতো গর্জে উঠে, আবার কখনো হযরত আবু বকরের মতো নরম ভাষায়। উভয় রকম বক্তৃতার উদাহরণ ইসলামী ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায়।
৫ ই আগষ্টের পর খতীবগণ মসজিদের মিহরাব ও মিম্বার থেকে নির্ভয়ে কথা বলতে পারবেন বলে আমরা আশান্বিত ছিলাম। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই আমাদের সেই আশার গুড়ে বালি ছিটিয়ে দিয়েছে কতিপয় অসাধু, অতি উৎসাহী রাজনৈতিক নেতারা।
খতীব সাহেবরা যেন সমাজ-রাষ্ট্রকে বিষিয়ে তোলা চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বয়ান না করেন এই জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। ওয়াজ মাহফিল এবং মিম্বারে বয়ানরত অবস্থায় বাধা বিঘ্ন ঘটানো হয়। দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবে পূর্বের ন্যায় চাকরিচ্যুত করা হয়। অরাজনৈতিক সরকার থাকার কারণে শুধু অন্ধকার শ্রীঘরের মেহমানদারী খতীবদের নসীবে জুটেনি ।
তবে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় গেলে খতীবদের অবস্থা যে ভয়াবহ হবে তা সহজেই অনুমেয়। খতীবদের কেউই আপন নয়। নিজ দলের স্বার্থ বিরোধী বক্তব্য হলেই খতীব সাহেবরা তাদের কাছে মন্দ হয়ে যান, শত্রুতে পরিনত হন।
কি সেক্যুলার দল! কি ইসলামপন্থী দল! সকলের এজেন্ডা একই যে, খতীব সাহেব আমাদের দলের কোনও ব্যক্তির অনৈসলামিক আচরণের সমালোচনা করতে পারবেন না বা মুসল্লীদের সতর্ক করতে পারবেন না। তার জলন্ত কয়েকটি উদাহরণ হালে আমরা দেখেছি। যেমন, বড় একটি রাজনৈতিক দলের নেতা যখন বললেন যে, আমরা শরিয়াহ আইন চাইনা, ইসলামপন্থীদের ফ্যাসিস্ট সরকারের মতো মৌলবাদী বলে তাচ্ছিল্য করলেন, তখন খতীব সাহেবগণ জাতিকে উক্ত রাজনৈতিক দল সম্পর্কে সতর্ক করে তাদের তীব্র রোষানলের সম্মুখীন হন।
সদ্য সমাপ্ত হওয়া দূর্গা পুজোর সময় মন্দিরে গিয়ে দেশের প্রাচীন, সবচেয়ে সুসংগঠিত একটি ইসলামী দলের সুপ্রসিদ্ধ আইনজ্ঞ নেতা রোযা আর পুজাকে ‘একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ’ বলে অমুসলিমদের প্রিয় পাত্র হতে চেষ্টা করে আলেমদের আস্থা হারালেন।
তাওহিদের অতন্দ্র প্রহরী খতীবগণ উক্ত বক্তব্যের জোরালো প্রতিবাদ করে এবার ইসলামী দলটির কতিপয় অতি উৎসাহীদের ক্ষোভের মুখে পড়লেন। বিশেষ করে উত্তরাস্থ একটি মসজিদের খতীব, দেশের পরিচিত আলেম, হযরত মাওলানা নাজমুল হাসান সাহেবকে গতকাল জুমার বয়ানের পূর্বে চিঠির মাধ্যমে সতর্ক করার যে স্পর্ধা ইসলামী দলটির আঞ্চলিক নেতৃবৃন্দ দেখিয়েছেন, তা দেখে আলেমদের কলিজায় রক্তক্ষরন হয়েছে।
ইতিপূর্বে তাদের সমর্থন করেছেন এমন অনেক খতীব সাহেবগণ ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন যে উক্ত দলটি ক্ষমতার ভাগ পেলে ভিন্ন মতের আলেমদের উপর ফ্যাসিস্ট সরকারের ন্যায় জুলুম করে কিনা?
মাওলানা নাজমুল হাসানের জুমার বয়ানে বসে চিঠিটি ছিঁড়ে ফেলার দৃশ্য নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। খতীব সাহেবের উক্ত সাহসী ভূমিকা নেটিজেনের প্রশংসা ও সমালোচনা কুড়াতে সক্ষম হয়েছে। দেশে যখন ইসলামপন্থীদের ঐক্যের প্রক্রিয়া চলমান এবং চুড়ান্ত পর্যায়ের দিকে অগ্রসর তখন দলটির কতিপয় নেতাদের ভূমিকায় আমরা আশাহত।
ইসলামী সংগঠনটির উচিত উক্ত ঘটনার নোটিশ নেওয়া এবং সংশ্লিষ্টদের খতীব সাহেবের কাছে ক্ষমা চাইতে পাঠানো। প্রয়োজনে সংগঠনের আমীরে মুহতারাম যদি খতীব সাহেবের হাল পুরসি করেন তাহলে তার মহানুভবতার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে এবং তার প্রতি আলেমদের আস্থা বাড়বে বলে মনে করি। দলটির উচিত আলেমদের পরামর্শ ও দোয়া নিয়ে পথ চলা। বিশেষ করে সব ঘরানার আলেমদের সাথে মজবুত সুসম্পর্ক গড়ে তোলা। তাহলেই দেশবাসী এবং উম্মাহ উপকৃত হবেন। আর সবচাইতে বেশী উপকার দলটিরই হবে।
সম্পাদক,
হামিদুল ইসলাম নাফিস
Voice Of Islam 24

